Header Ads

বাংলা ভাষা নিয়ে বাঙালিকে সচেতনতার বার্তা দিতে মহানগরের দখল নিল কয়েকটি বাংলা লেখা হোর্ডিং


কলকাতার বুকে বাঙালির সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য রাস্তায় রাস্তায় দখল নিচ্ছে বাংলা হোর্ডিং। যেখানে সতর্ক করা হচ্ছে প্রতিটি বাঙালিকে। কখনো লেখা পরাঠার থেকে পরোটা ভালো। বলতেও। শুনতেও। এছাড়াও সওরবের থেকে সৌরভ ভালো। বা সামোসার থেকে শিঙাড়া ভালো। এরকমই বেশ কিছু বড়ো বড়ো হোর্ডিং এ ছেঁয়ে যাচ্ছে নগর কলকাতা। 


হঠাৎ করে এমন হোর্ডিং কারা লাগাচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো খবর নেই। তবে হোর্ডিং এর নীচে লেখা ভালো ভাষা। এটা আসলে কী? এনাদের উদ্দেশ্যই বা কী? এমনই হাজার প্রশ্ন উঠে আসছে ভাষাপ্রেমী মানুষদের মনে। তারা অধীর আগ্রহে জানার চেষ্টা করছে যে কারা এই হোর্ডিং লাগাচ্ছে।

আমাদের বাঙালি সমাজের  কিছু মানুষের মধ্যে কেমন যেন একটা রুচি এসেছে যে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে নিজের জাতিসত্বাকে অন্যের কাছে বন্ধক রেখে অবাঙালি হয়ে ওঠা। যা বাংলা ভাষার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটা জাতির ভাষা তখনই বেঁচে থাকে যখন সেই জাতির মানুষ ভাষার প্রতি সচেতন হয়। দক্ষিণ ভারতের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি বেশ সচেতন। জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স থেকে শুরু মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর প্রত্যেকটা দেশে প্রাধান্য পেয়েছে সকল জাতির মাতৃভাষা। 

আপনারা খুব অবাক হবেন যদি মরিশাসের অবস্থা বলি। এখানে চুরাশি শতাংশ মানুষ ক্রেওল ভাষায় কথা বলেন, পাঁচ শতাংশ মানুষ ভোজপুরি, তিন শতাংশ মানুষ ফ্রেঞ্চ ও সাত শতাংশ মানুষ অন্যান্য ভাষায় কথা বলে থাকেন। তবুও সেখানে কোনো আলাদা করে জাতীয় ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা নেই। প্রতিটি ভাষাকেই তারা সমান মর্যাদা দিয়ে থাকে। 

ভারতেও কোনো রাষ্ট্রভাষা বা জাতীয় ভাষা নেই। ভারতের সংবিধানেও আলাদা করে কোনো জাতীয় ভাষার উল্লেখ নেই। অথচ হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বানানোর একটা দীর্ঘ পরিকল্পনা চলছে। অহিন্দি ভাষাভাষী মানুষের ওপর জোরপূর্বক হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে ভারতে। যা গনতন্ত্র বিরোধী। সংবিধানকেও খর্ব করা। রাষ্ট্রভাষা মানে হলো একটা দেশের মানুষ যে সমস্ত ভাষাগুলোতে কথা বলে সেই ভাষাগুলোকে রাষ্ট্রভাষা বলে। কিন্তু ভারতে রাষ্ট্রভাষার সংজ্ঞাটাকেই বদলে ফেলা হচ্ছে। 

যারা বাঙালি হয়েও বাংলা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না তারা হয়তো ভুলে গেছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু, যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ, দয়ার সাগর পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাউলসাধক লালন ফকির, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দোপাধ্যায়, অর্মত্য সেন, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু সবার মাতৃভাষাই বাংলা। ওনারা সকলেই সাচ্ছন্দবোধ করতেন বাংলা ভাষা বলতেই। 


বর্তমানে মডার্ন যুগের দোহাই দিয়ে ইংরাজি বা হিন্দি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বাঙালিকে একদিন বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মাতৃভাষা মানে হলো মায়ের ভাষা। কাজেই সুযোগ্য সন্তান হয়ে মাতৃভাষার দায়িত্ব পালন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। মহানগরের বুকে বাংলা ভাষা দিনের পর দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। বহিরাগতদের সংখ্যা প্রভূত হারে বাড়ছে আজকাল। যে কারণে হিন্দি ভাষার দৌরাত্ম্য শহরের আনাচে-কানাচে থাবা বসাচ্ছে। এরই মাঝে যদি বঙ্গালের থেকে বাংলা ভালো। বলতেও। শুনতেও। এমন কিছু হোর্ডিং যদি সহসাই দেখতে পাওয়া যায় শহরে তাহলে একজন বাঙালি হিসেবে নিজের ভাষাপ্রীতি বহুগুণ বেড়ে যায়। এইসব পোস্টার দেখে মনে হয় বাঙালি জাতিসত্বা মারা যায়নি। 

কয়েকটি অজানা মুখ রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোতে এভাবে বাংলা হোর্ডিং লাগিয়ে যেভাবে বাঙালির কাছে সচেতনতার বার্তা ছড়াচ্ছে। তা থেকে অনেক জাতিসত্বা বিকিয়ে দেওয়া মানুষের মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে যে আমি কী সত্যিই বাঙালি? বাংলা ভাষা বাঁচানোর জন্য যারা এমন দায়িত্ব নিয়েছে তাদের শতকোটি কুর্নিশ।  

প্রতিবেদন- সুমিত দে

No comments