Header Ads

উৎসবের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা


অনেকে বলে থাকেন যে এইসব উৎসব করে কী হয়। এই যে দুর্গাপূজাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হয় আদৌ কী কিছু লাভ হয়। আমি মনে করি প্রচুর লাভ হয়। বেশ কিছু কারণ দিয়ে আপনাদের বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে চলেছি।

দুর্গাপূজা হল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। প্রায় চারদিন ধরে এই উৎসব চলে। কিন্তু তার প্রস্তুতি চলে প্রায় তিনমাস আগে থেকে।

মণ্ডপ তৈরি থেকে প্রতিমা বানানোর কাজ চলে প্রায় দুই থেকে তিনমাস ধরে। এতে কাজ পায় সারা বাংলার লক্ষ লক্ষ গরীব মানুষ। দুর্গাপূজাতে বাংলাতে বিভিন্ন থিমের মন্ডপ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন রকমের লাইট দিয়ে রাস্তা সাজানো হয়।এখানে বিভিন্ন ডেকোরেটার, ইলেকট্রিশিয়ানরা কাজের সুযোগ পায়।এছাড়াও মাঠে-ঘাটে বিভিন্ন স্টল, দোকান সাজিয়ে বিশাল মেলার আয়োজন ঘটে।যেখানে খুচরো গরীব ব্যবসায়ীরা হাজারো সরঞ্জাম বিক্রয় করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ পায়।   

দুর্গাপূজা বাঙালিদের কাছে এখন বাণিজ্যের সঠিক সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গাপূজাতে মানুষজন নতুন নতুন পোশাক পরে  তাদের পরিবারের সাথে পূজো দেখতে যায়। তাঁরা নতুন জামাকাপড় কেনাকাটা করার জন্য গ্রাম-শহরের জামাকাপড়ের দোকানে রোজগার আসে। তাছাড়াও পূজোর যাবতীয় উপকরণ যেমন দশকর্মা ভান্ডার, পূজোর প্রসাদের জন্য ফলমূল, বাতাসা প্রভৃতি বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হয়। তাতে খুচরো ভুষিমাল দোকানগুলোতে অনেক রোজগার আসে।
দুর্গাপূজাতে ফার্স্টফুডের দোকান থেকে মিষ্টান্ন দোকানগুলোতে ভিড় জমে যায়। খাবার দোকান থেকে হোটেলগুলোতে প্রচুর টাকা আসে। পূজোর কিছুদিন আগে থেকেই বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের সৌন্দর্যের জন্য পার্লারে যায়। যার জন্য লাভবান হয় বিউটিশিয়ানরা।

এছাড়াও দুর্গাপূজার জন্য বিভিন্ন কোম্পানি লক্ষ লক্ষ টাকা স্পনসর করে পাড়ার পূজোর জন্য। ফিল্ম থেকে শুরু করে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি আমজনতার জন্য প্রচুর পরিমাণে  নিত্যনতুন গান ও সিনেমা বানায়। এই মরসুম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও সিনেমার জন্য একটা রমরমা সময়।

মিউজিক ও সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও লাভবান হয় পাবলিশিং হাউস ও প্রিন্টিং হাউসগুলো।প্রিন্টিং হাউস থেকে পূজোর ব্যানার,কার্ড,বিভিন্ন সংঘ ও পূজো কমিটির ম্যাগাজিন ছাপানো হয়। পাবলিশিং কোম্পানিগুলো পূজো সংখ্যার জন্য পত্রিকা প্রকাশ করে যা কেনার জন্য বই দোকানগুলোতে পাঠকদের ভিড় জমে যায়।

আবার দুর্গাপূজাতে বাংলার প্রত্যেক স্থানে বাউল, কীর্তন, যাত্রাপালা, লোকগীতি, নৃত্য, সংগীতানুষ্ঠান, ম্যাজিক শো, যোগব্যায়াম, ছৌঁ-নাচ,কবিগান,কবিতা,গল্পপাঠ ও শ্রুতিনাটকের আসর বসে। যে কারণে খুদে-মাঝারি-বড়ো সব শ্রেণির সৃজনশীল মানুষ ও শিল্পীরা কাজের সুযোগ পায়। শুধু তাই নয়, দুর্গাপূজোতে গরীবদের বস্ত্র বিতরণ করা হয়, নরনারায়ণের সেবা করে গরীব মানুষদের খাওয়ানো হয়।কোথাও কোথাও আবার দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের বই-খাতা বিতরণ করা হয়।

 দুর্গাপূজার জন্য কুমোরটুলিতে সারা বছর ধরে মৃৎশিল্পীরা কাজ পাচ্ছে। ফুলচাষীরা ফুল বিক্রি করে লাভবান হয়। কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে তাঁতশিল্প, রঙশিল্প, হস্তশিল্প, গহনা শিল্প প্রত্যক খাতে অসংখ্য রোজগার হয়। 

এককথায় বলতে গেলে দুর্গাপূজার মতো প্রত্যেকটা উৎসব গরীব মানুষদের মুখে অনেকটাই হাসি নিয়ে আসে। তাছাড়াও জীবনে বাঁচতে হলে উৎসবেরও প্রয়োজন রয়েছে। কারণ উৎসব হলো মিলনক্ষেত্র যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ এক হয়ে আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে। মানুষের কাছে সবচেয়ে বড়ো জিনিস হলো মন৷ এই মনের মিলনও উৎসবের মাধ্যমেই ঘটে। মানুষের গরীব হৃদয় উৎসবের কারণে বড়ো হয়ে যায়। অতএব উৎসব কখনোই তুচ্ছ বস্তু নয়। 

অনেক মানুষ যারা পূজোর জন্য একটাকাও খরচ করতে চায়না। পূজোতে চাঁদা দিতে চায়না। তাঁরা ভাবে যে পূজোতে চাঁদা দিলে তাতে আমার কী লাভ হবে। তাঁরা কেবল নিজেদের স্বার্থটাই দেখে। কিন্তু কখনো ভাবেনা যে এ টাকাতে একজন গরীব মানুষের পেট ভরবে।তবে কিছু জায়গায় জোর করে চাঁদা তোলার মতো বিক্ষিপ্ত ঘটনাও ঘটে থাকে। যদিও সব জিনিসেই ভালো-খারাপ দিক রয়েছে। তা নিয়ে বিস্তারিত যাচ্ছিনা। কারণ সোনালি চাঁদেও কলঙ্কের দাগ রয়েছে। তবে অনেক ভালো মনের মানুষ নিজেদের পকেট থেকে চাঁদা দিয়ে পাড়াতে পূজোর আয়োজন করে।তাদের টাকাতে উৎসবগুলোতে গরীব মানুষেরা অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছে।অতএব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উৎসবের বিরাট বড়ো ভূমিকা রয়েছে।

আজ সিঙ্গাপুরের এই যে এতো উন্নতি তার পিছনেও কিন্তু উৎসবের অবদান বিরাট। পৃথিবীর মধ্যে সিঙ্গাপুর হলো এমন একটি দেশ যেখানে প্রতিদিন উৎসব হয়। এখানে সারা পৃথিবীর সব দেশের সব ধর্মের মানুষ বসবাস করে। যার ফলে প্রতিদিন কোনো না কোনো উৎসব চলে এখানে। আর আমাদের বাংলাতে বারো মাসে তেরো পার্বণ ঘটে।যা কখনোই খারাপ নয়। ২০১৮ সালে কলকাতায় চিনের সরকার লাইট স্পনসর করতে চলেছে। এমনকি তাঁরা বাংলার খুদে শিল্পীদের চিনের আর্টশিল্পের উন্নতির জন্য চাকুরীর ব্যবস্থা করছে। এগুলো কোনোটাই সম্ভব হতোনা যদি উৎসব না থাকতো।          
                                                               লেখায়-সুমিত দে        

No comments