Header Ads

বিলুপ্তির পথে হুগলির ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কারকান্ডা


বাংলার অলিতে-গলিতে নানান ঐতিহ্য লক্ষ্য করা যায়। কথায় আছে 'শেষ নাই যার, বাংলায় তার সার'। বাংলার হরেক ঐতিহ্যের ভিড়ে যে বস্তুটি সোনার পাথরবাটি তা হলো মিষ্টি। যা দিয়ে বাঙালিকে সহজেই চেনা যায়। শক্তিগড়ের ল্যাংচা, ক্ষীরপাইয়ের বাবরশা, মেদিনীপুরের জিলিপি, বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ, নবদ্বীপের লাল দই, গঙ্গারামপুরের ক্ষীর দই, গুপ্তিপাড়ার গুঁফো সন্দেশ ও আরো অনেক অনেক মিষ্টি। এতো মিষ্টির ভিড়েও লুকিয়ে আছে বিভিন্ন লোভনীয় মিষ্টি, যার মধ্যে অন্যতম হলো হুগলির ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি 'কারকান্ডা।'  


কালের স্রোতে আজকে হারিয়ে যেতে বসেছে কারকান্ডা। এই মিষ্টান্ন মূলত মোয়ার বিভাগে পড়ে। কারকান্ডার বৈশিষ্ট্য হলো এই মিষ্টি শীতকালে এক মাস পর্যন্ত থাকে এবং বর্ষাকালে সহজেই নষ্ট হয়ে যায়৷ এই মিষ্টির বিবরণ দিতে গেলে জানতে হবে প্রণালী। এক কিলোগ্রাম কারকান্ডা তৈরি করতে গেলে খই লাগে ৩৫০ গ্রাম, চিনি ৬০০ গ্রাম, ঘি ১০০ গ্রাম, ভালো ছোট এলাচ ২০টি, দারুচিনি ৫ গ্রাম ও গোলমরিচ ২০ গ্রাম৷ গোলমরিচ বেশি হলে ঝাল হয়ে যাবে। খই জাঁতায় গুঁড়ো করে নিতে হয়। তারপর চিনি গলিয়ে রস করে করে সন্দেশ বানাতে হয়। এরপর মশলাগুলো হামনদিস্তা দিয়ে পিষে গুঁড়ো করে নিতে হবে। তারপর চিনির লেচির সঙ্গে মেশাতে হবে ঘি-মশলা, পুরোটা মাখিয়ে খইয়ের সঙ্গে দিতে হবে। এবার দু'হাতের তালুতে যতটা ধরে ততটা মাখা নিয়ে গোল করে পাকাতে হবে। এক কিলোতে ২০ টির মতো কারকান্ডা তৈরি হয়। 

কারকান্ডার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অসাধারণ ইতিহাস। সে বহুকাল আগের কথা, রাজা রামমোহন রায়ের পরবর্তী সময়ে ছিল তাঁর নাতি হরিমোহন রায়ের জমিদারি। সেই সময় একটা রীতি ছিল, বছরের একটি বিশেষ দিনে প্রজারা জমিদারের কাছারিতে তাদের খাজনা দিতে আসতো, সঙ্গে জমিতে উৎপাদিত কিছু ফসল, বাড়িতে তৈরি মিষ্টান্ন ইত্যাদি প্রজারা নিয়ে আসতো জমিদারের মনোরঞ্জনের জন্য। যাকে বলা হতো 'পুণ্যাহ'।

তাহলে কীভাবে নামকরণ হলো এই মিষ্টির? পুণ্যাহের দিন জমিদার বাড়িতে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হতো। এমনই এক উৎসবের আবহে কুঞ্জবিহারী মোদক নামের এক ময়রা অদ্ভুত এক মিষ্টির হাঁড়ি এনে জমিদারের পায়ের কাছে রাখলেন। হাঁড়ির ঢাকা খুলতেই গাওয়া ঘি আর বিভিন্ন মশলার গন্ধে দিকবিদিক ম ম করে উঠতে লাগলো। মিষ্টির চেহারা ও স্বাদ-গন্ধ দেখে জমিদার মশাইয়ের চোখে-মুখে হাসির আভা ফুটে উঠতে থাকে। জমিদার হঠাৎ বলে ওঠেন 'এ কার কাণ্ড?' কুঞ্জবিহারী মোদক বাবু সঙ্গে সঙ্গে জানান এ তারই কাণ্ড। এরপর জমিদার মিষ্টান্নের নাম রাখলেন 'কারকান্ডা'।

কুঞ্জবিহারী বাবুর আবিষ্কৃত এই মিষ্টি অল্প সময়েই গোটা হুগলি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটা সময় ছিল যখন হুগলির বিভিন্ন বনেদি বাড়ির অনুষ্ঠান বা কাজঘরে এই মিষ্টান্ন নিয়ে আসা হতো। বলা ভালো বনেদি বাড়ির 'মাণদণ্ড' ছিল এই কারকান্ডা। উৎসব-পার্বণেও এর কদর ছিল সব মিষ্টির শীর্ষে। হুগলির রাধানগরে এককালে কারকান্ডা রমরমিয়ে বিক্রি হতো। যত দিন যাচ্ছে এই মিষ্টির কদর দিন দিন কমছে। বর্তমানে কুঞ্জ বিহারী মোদকের বংশধররা এই মিষ্টি তৈরি করেন। এছাড়াও কিছু কিছু মিষ্টি ব্যবসায়ীরাও বানান তবে তা অর্ডার করলে। তাছাড়া কারকান্ডার সেই আসল স্বাদও এখন আর নেই। এর প্রধান কারণ অবশ্যি কনকচূড় খইয়ের অভাব। কারকান্ডার দামও এখন প্রচুর। চাহিদাও একেবারে কমে গেছে এই মিষ্টির৷ পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি আজকে এই মিষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ না নেয় তাহলে খুব শীঘ্রই বিলুপ্ত হবে হুগলির ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কারকান্ডা। 

প্রতিবেদন- সুমিত দে


No comments