Header Ads

বাংলার জগৎ বিখ্যাত ডোকরা শিল্প কী ধ্বংসের মুখে?


পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শিল্প হলো ডোকরা শিল্প। 'হারনো মোম ঢালাই' পদ্ধতিতে শিল্পকর্ম হলো ডোকরা শিল্প। পশ্চিমবঙ্গে ডোকরা শিল্পের সূচনা হয় কয়েকশো বছর আগে। ঝাড়খণ্ড থেকে পুরুলিয়া হয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতে বিস্তার লাভ করে ডোকরা শিল্প। বাংলার জঙ্গলমহলে ডোকরা শিল্পের মোটামুটি জনপ্রিয়তা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান জেলা ডোকরা শিল্পের  জন্য বিখ্যাত। 


জঙ্গলমহলে ডোকরা শিল্পীরা টলিতে ছাতা লাগিয়ে তার তলাতে মোম ঢালাইয়ের যন্ত্র লাগিয়ে বিভিন্ন ভাস্কর্য ও মূর্তি তৈরি করে থাকে৷ ধান মাপার কুনকে বা পাই, পিতল, পয়সার কৌটো, লক্ষীর ঝাঁপি, ফুলদানি, ফুলের টব, বালতি, তামা, কাঁসা ও কলড্রিঙ্কসের কেন ব্যবহৃত হয় এই শিল্পে। ডোকরা প্রধানত দুই প্রকারের হয় একটি ফাঁকা ডোকরা ও অপরটি ভরাট ডোকরা৷ ফাঁকা ডোকরার ছাঁচটি মাটি দ্বারা নির্মাণ করা হয়। তার ওপর লেপে দেওয়া হয় প্রাকৃতিক মোমের আস্তরণ৷ কিয়ৎক্ষণ পর এটিকে উত্তপ্ত করা হয় আগুনের তাপে। মাটি প্রচণ্ড গরম হওয়ার পর ছাঁচটির সরু পথ দিয়ে মোম গলে বেরিয়ে যায় এবং সে পথে তরল ধাতু মিশ্রণ নিক্ষেপ করা হয়। আর ভরা ডোকরার সম্পূর্ণ ছাঁচ প্রাকৃতিক মোম দ্বারা নির্মিত হয়। তার ওপর মাটি লাগানো হয়৷ অর্থাৎ ফাঁকা ডোকরা শিল্পের বিপরীত প্রক্রিয়া হলো ভরাট ডোকরা শিল্প৷ দুটোরই পদ্ধতি একই। 

গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে ডোকরা শিল্পকর্ম ব্যবহৃত হয়৷ বিভিন্ন জীবজন্তু, ধর্মীয় দেব-দেবীর মূর্তি ও বাঙালি মহাপুরুষদের মূর্তি মূলত ডোকরা শিল্পের মাধ্যমে বানানো হয়। একসময় প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা ছিল এই শিল্পের। কিন্তু বর্তমানে এই শিল্প জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। ফলপ্রসূত বহু ডোকরা শিল্পীরা কাজ হারাচ্ছেন৷ বাংলার ডোকরা শিল্প এখন লুপ্তপ্রায়। প্রশাসন যদি ডোকরা শিল্প বাঁচানোর জন্য একজোট হয়ে উদ্যোগ না নেয় তাহলে এই শিল্পের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। বাংলার এই শিল্পটি ধ্বংস হওয়া মানে বাঙালির ঐতিহ্যের ক্ষতি। যে ক্ষতিপূরণ সহজে মেটানো যাবে না। অনেক সাধারণ মানুষের যাদের পেশা হয়তো ডোকরা শিল্প তাদের এ শিল্প ধ্বংস হলে অন্য কাজ খুঁজতে হবে। যা অত্যন্ত কঠিন তাদের পক্ষে।

বাঁকুড়া জেলার বিকান, লক্ষীসাগর, খাতড়া, পুখুরিয়া, লাদনা, ছাতনা ও শববেড়িয়া, বর্ধমান জেলার গুসকরা, দরিয়াপুর, পুরুলিয়া জেলার নাডিহা হলো ডোকরার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ডোকরা শিল্পের মধ্যে বিকান ও দরিয়াপুরের এক জগৎজোড়া খ্যাতি আছে। কর্মকার ও মালাহার সম্প্রদায়ের মানুষেরা ডোকরা  শিল্পের সঙ্গে যুক্ত৷ এ কাজে যথেষ্ট কাঁচামাল ও শ্রম প্রয়োজন হয়। ডোকরা শিল্পকর্ম বানানোর কাজটা খুব জটিল। যদিও এনারা আদিম ধাতু-ঢালাই শিল্পে বেশ দক্ষ। পুরোপুরি দেশজ পদ্ধতিতে শিল্পকর্ম গড়ে তোলেন তারা। সময়ের নিয়মে থিতু হলেও এনারা প্রধানত যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষ। শুধু মূর্তিই এনারা বানান না, এছাড়াও ঘুঙুর, কানের দুল, গলার হার, পায়ের মল ও নানা ধরণের ধাতব অলঙ্কার যেমন বাসন, কোসা, জাঁতি, সিঁদুর কৌটোও তৈরি করেন। 

আউসগ্রামের দরিয়াপুরের ৫৫ থেকে ৬০ টি পরিবার ডোকরা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। যারা বংশ পরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও নিপুণ হাতে প্রতিভার সহিত ডোকরা শিল্পের উন্নতি করছেন। এই গ্রামের পাঁচজন শিল্পীর ঝুলিতে জাতীয় পুরস্কারও আছে। দরিয়াপুরের ডোকরা শিল্প বিদেশেও প্রসার লাভ করেছে। ডোকরা শিল্পের উন্নতি হলেও ডোকরা শিল্পীর বহুদিক দিক দিয়ে পিছিয়ে। তারা লেখাপড়ার সুযোগ না পাবার জন্য ঠিকমতো বাংলা পড়তে বা লিখতে পারেন না। তাদের সকলেরই বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। এর মূল কারণ হলো প্রশাসন থেকে ডোকরা শিল্পীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। বাংলার ডোকরা শিল্প ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য উদ্যোগ অন্য ভাবে নেওয়া হচ্ছে। বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ডোকরা শিল্পকে বাঁচাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। 

দরিয়াপুরে শিল্পীদের একটু শিক্ষিত করে তুলতে ২০১৮ সালে বাংলা নাটক ডট কম ও নেক্সট কানেক্ট নামের দুটো সংস্থা দায়িত্ব নেয়। পথনাটক অথবা নাট্যশালার মধ্য দিয়ে শিক্ষার পাঠ দেওয়া শুরু হয় তাদের। ঐ দুটো সংস্থা মনে করেন ডোকরা শিল্পীদের শিক্ষিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন৷ তারা শিক্ষিত না হওয়ার জন্য নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন৷ ব্যাঙ্কের ফর্ম পূরণ, ব্যাঙ্কে টাকা লেনদেন, বাসের নম্বর ঠিকঠাক ভাবে বুঝতে পেরে বাসে চড়া প্রভৃতি কাজে পারদর্শী করে তোলা হচ্ছে তাদের। প্রতিদিন বিকেল তিনটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত তাদের ক্লাস নেওয়া হয়৷ এই ক্লাসে বাংলা, ইংরেজি ও কম্পিউটার শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে এদের। এতে করে আগামীদিনে ডোকরা শিল্পীরা স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারবে। 

বাংলা নাটক ডট কম ও নেক্সট কানেক্টের পাশাপাশি সরকারি সংস্থা খাদিও এগিয়ে এসেছে ৷ এমনকি ২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডের একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও এগিয়ে আসে৷ দরিয়াপুরে সেভাবে সরকারের তরফে উদ্যোগ না নেওয়া হলেও বাঁকুড়া বিকনা যাকে ডোকরা গ্রাম বলা হয়, সেখানে সরকারের সহায়তায় তারা বিভিন্ন মেলাতে স্টল বসানোর সুযোগ পেয়েছে। বিকনার ষাটটি পরিবার ডোকরা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। পুরুষ ও মহিলাদের বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠী এখানে গড়ে উঠেছে ডোকরা শিল্পকে কেন্দ্র করে৷ দুর্গাপুজোতে এখানে কলকাতা থেকে মণ্ডপে ডোকরা ব্যবহারের বরাত আসে। পুজো-পার্বণে আর্থিক ছয় থেকে সাত লক্ষ টাকা রোজগার হয় এনাদের। 

বাংলার ডোকরা শিল্প সবে আন্তর্জাতিক প্রসারে অগ্রণী হয়েছে এমন সময় ডোকরা শিল্পে বাঁধার দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে লকডাউন। ২২ শে মার্চ লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলার ডোকরা শিল্পের অবস্থা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। প্রশাসন ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী ডোকরা শিল্পীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে আয় প্রভূত পরিমাণে হ্রাস পাচ্ছে। ডোকরা শিল্পীদের আশঙ্কা লকডাউন কেটে গেলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে বছর দুই লাগবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো ডোকরা শিল্প স্বাভাবিক ছন্দ কী আদৌ ফিরে পাবে? আমরা চাই বাঙালির গর্বের ডোকরা শিল্পের সুদিন ফিরে আসুক৷ ২০১৫ সাল থেকে বিদেশে বাংলার ডোকরা শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর এখন লকডাউন ডোকরা শিল্পীদের সর্বনাশ করছে। যদিও আশা রাখা যায় যে বাংলার ডোকরা শিল্প তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে সফল হবেই। সবচেয়ে ভাববার বিষয় হলো বাংলার ডোকরা শিল্প বিশ্ববিখ্যাত হওয়া সত্বেও তার জিআই ট্যাগ নেই, তাই প্রশাসনকে বাংলার ডোকরা শিল্পকে জিআই স্বীকৃতির জন্য দাবী জানাতে হবে। 


তথ্যসূত্র- এই সময়, এনটিভিডব্লুবি নিউজ, দ্য বেঙ্গলি ন্যাশনালিস্ট ফেসবুক পেজ

No comments