Header Ads

পলাতক আট নৌসেনাকে নিয়ে দিল্লিতে ঘুঁটি সাজালেন এক ভারতীয় নেভি কম্যান্ডার। ন্যাভাল ইন্টেলিজেন্সের কর্তা বঙ্গসন্তান মিহির কুমার রায়


২০শে মার্চ ২০১৯, টাইমস অব ইন্ডিয়া কাগজে একটা ছোট্ট খবর বেরিয়েছিল। মুম্বাইয়ের এক হাসপাতালে মারা গেলেন ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন সামন্ত। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ভারত হোক বা বাংলাদেশ, কোথাও আজকের প্রজন্ম জানেন না, একাত্তরে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল এই বঙ্গসন্তান। ‌


কি করেছিলেন ইনি ? জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে পঞ্চাশ বছর। ২৯শে মার্চ, ১৯৭১...পশ্চিম ফ্রান্সের তুঁলো বন্দরে নোঙর করা ছিল ম্যাংরো নামে একটা সাবমেরিন। পাকিস্তান সরকার এটা কিনেছিল তাদের নৌবাহিনীর জন্য। দেশে নিয়ে যাবার জন্য সেখানে তখন পৌঁছেছে তাদের নৌসেনারা, যার মধ্যে চৌদ্দজন ছিলেন বাঙালি। 

পঁচিশে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যুত্থান ও ঢাকায় গণহত্যার খবর ততদিনে এসে পৌঁছেছে ফ্রান্সের ঐ বন্দরেও। সাবমেরিন নিয়ে যেতে আসা ঐ বাঙালি সেনারা প্রথমে ঠিক করলেন ওটাকে হাইজ্যাক করে মুক্তিযুদ্ধে ভাগ নেবেন, পরে সিদ্ধান্ত নিলেন পালিয়ে আসবেন ভারতে। মোট চৌদ্দজন সেনার মধ্যে আটজন অন্ধকার নামলে বন্দর এলাকা ছেড়ে পালান। সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেন স্পেনের ভারতীয় দূতাবাসে। স্থানীয় পুলিশের চোখ এড়িয়ে দূতাবাস কর্মীরা একদিন তাদের তুলে দেন দিল্লি গামী বিমানে। বাকি ছ'জনের পরিবার করাচীতে থাকায়  বাধ্য হলেন সাবমেরিনে রয়ে যেতে।

পাক ভারত যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়ে পলাতক এই আট নৌসেনাকে নিয়ে দিল্লিতে ঘুঁটি সাজালেন এক ভারতীয় নেভি কম্যান্ডার। বাহিনীতে 'মিকি' নামে পরিচিত এই বঙ্গসন্তান ছিলেন ন্যাভাল ইন্টেলিজেন্সের কর্তা মিহির কুমার রায়। শৈশব কেটেছে  বরিশালে, তাই কিছুটা পরিচয় ছিল পূর্ব বাংলার নদীনালার সাথে। তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত ছিল এই রণ কৌশল, যার কোড নেম #Operation_X. পূর্ববাংলার সামরিক প্রশিক্ষণবিহীন কিন্তু শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্ত তরুণদের ট্রেনিং দিয়ে তাদের দিয়েই জলের উপর এবং জলের গভীর থেকে নৌযান এবং বন্দরের উপর হামলা চালানোই ছিল এর লক্ষ্য। প্রসঙ্গত এই বঙ্গসন্তানটির নিখুঁত রণকৌশলেই ঐ যুদ্ধে বঙ্গোপসাগরে সলিল সমাধি ঘটে পাকিস্তান সাবমেরিন গাজী'র।

চূড়ান্ত আক্রমনের জন্য তিনি নির্বাচিত যোদ্ধাদের থেকে তিরিশ জনের এক একটা ব্যাচ গঠনের জন্য বলেন। সেনা কর্তাদের বলেন তাদেরকে বিস্ফোরকের উপর নিখুঁত ট্রেনিং দিতে, যাতে তারা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জাহাজ, ফেরি, পন্টুন, বার্জ এগুলোকে ধ্বংস করতে পারে। সেই সাথে জলের নীচে ব্যারিকেড বা ফাঁদ তৈরি করে তেলের ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে পাকিস্তানের পুরো নৌশক্তি ও পরিবহন।

কমান্ডো নির্বাচনের ভার দেন সাবমেরিন থেকে পালিয়ে আসা ঐ বাঙালি নৌসেনাদের। কোন কোন বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, সেটাও তিনি বলে দেন তাঁর নোটে। দক্ষ সাঁতারু হবার সাথে সাথে তারা যেন হয় দৈহিক এবং মানসিক শক্তিতে বলীয়ান। বয়স ১৮ থেকে ৩০ এর মধ্যে। উপকূলীয় এলাকা চালনা, খুলনা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর এবং বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলের ছেলেদের বেছে নেবার জন্য পরামর্শ দেন।

প্রথম ব্যাচের লোক বাছাই করার পরে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসা হয় সীমান্তর এপারে পলাশীতে। একদিন যেখানে স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, আড়াইশো বছর পরে সেই পলাশীতেই বাংলার একদল দামাল ছেলে প্রস্তুতি নিতে থাকে দেশ স্বাধীন করার।

আগস্টের মধ্যেই প্রথম ব্যাচ তৈরি হয়ে যায় শত্রুর বুকে আঘাত করার জন্য। ছোট ছোট দলে ভাগ করে বাংলাদেশের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের। সবার সাথে ছিলো লিমপেট মাইন, সাঁতার কাটার জন্য এক জোড়া ফিন এবং হাতিয়ার। দলনেতার কাছে স্টেনগান আর একটা ছোট্ট রেডিও। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট গান বাজিয়ে সিগন্যাল দেওয়া হবে অপারেশনের জন্য তৈরি হওয়ার জন্য। অন্য গান বাজলে বুঝতে হবে আঘাত হানার সময় এসেছে।

আগস্ট মাসের চৌদ্দ তারিখ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত নৌঘাঁটিতে একযোগে আক্রমণ চালায় ভারতীয় নৌসেনা ও মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোরা, নেতৃত্বে থাকেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন মনীন্দ্র নাথ সামন্ত। ডুবিয়ে দেয় তারা অসংখ্য জাহাজ, ধ্বংস করে বন্দরের ইনফ্রাস্ট্রাকচার। খুলনা বন্দরে হামলা চালানোর সময় পাক বিমান বাহিনীর তিনটি স্যাবার জেট আক্রমন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসা 'পদ্মা' ও "পলাশ" নামে গানবোটের ওপর, ডুবে যায় সে দুটি। জীবন বিপন্ন করে ক্যাপ্টেন সামন্ত উদ্ধার করেন বহু মুক্তি সেনাকে। শহীদের মৃত্যু বরণ করেন কয়েকজন সেনা। কিন্তু ক্যাপ্টেন সামন্ত এবং এই নৌ কমান্ডোদের সফলতা নাতো কেবল যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়েছে এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীরও জন্ম দিয়েছিলো তারা। অকল্পনীয় এই সাফল্যের জন্য ক্যাপ্টেন মনীন্দ্র কে মহাবীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়। 

আরো একটি পরিচয় আছে এই বঙ্গসন্তানের...বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকেই সেখানে চীফ অব স্টাফ নিয়োগ করেন। তিনিই আজ অব্দি একমাত্র ভারতীয় যিনি একটি বিদেশী রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। অবসরের পর সেদিনের নৌযুদ্ধের সেই অজানা ও রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে লিখেছেন যে বই, তা দীর্ঘদিন ছিল বেস্টসেলারের তালিকায় ! 

No comments