তিনি সকলের মা


সুভাষিণী মিস্ত্রী। সুভাষিণী দেবী কোনোদিন স্কুলে পা রাখেননি। কিন্তু তার জীবনের কাহিনী হার মানায় রূপকথার সমস্ত গল্প কে। সুভাষিণী দেবী আমাদের সকলের অনুপ্রেরণা। তার জীবনের একটাই স্বপ্ন গরিব সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া তার লড়াইকে আমরা কুর্নিশ জানাই।



সুভাষিণী দেবীর জন্ম ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কুলবা গ্রামে এক অতি দরিদ্র পরিবারে। সুভাষিণী দেবীর বাবা ছিলেন ভাগচাষী, জন্ম থেকেই অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সুভাষিণী দেবীরা ছিলেন ১৪ ভাইবোন। সুভাষিণী দেবীর মা বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে বেড়াতেন সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু অভাবের তাড়নায়, ক্ষুধার জ্বালায় তার ৭ ভাইবোন মারা যায়।

মাত্র ১২ বছর বয়সে সুভাষিণী দেবীর বিয়ে হয়ে যায় হাঁসপুকুরের সাধন চন্দ্র মিস্ত্রী এর সাথে। সাধনবাবু চাষের জমিতে মজুরের কাজ করতেন। কিন্তু জীবন বদলে যায় ১৯৭১ এ, একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুভাষিণী দেবীর স্বামী। পেটের যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকা স্বামীকে নিয়ে সুভাষিণী দেবী ছুটলেন টালিগঞ্জে জেলা হাসপাতালে, কিন্তু সুভাষিণী দেবীর কাছে সেদিন পয়সা ছিল না। তার হাজারো অনুরোধ কেউ কানে দিলো না, কেউ এগিয়ে আসেনি তার স্বামীর চিকিৎসায়। বিনা চিকিৎসায় সুভাষিণী দেবীর স্বামী মারা গেলেন। সুভাষিণী দেবীর জীবনটা রাতারাতি বদলে গেলো। কিন্তু সেদিন সুভাষিণী দেবীর মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিলো, চিকিৎসার অধিকার কি শুধু পয়সাওয়ালাদের? গরীব মানুষের কি চিকিৎসার কোনো অধিকার নেই? সুভাষিণী দেবী সেদিন ঠিক করেছিলেন এমন কিছু একটা তিনি করবেন যাতে গরীব মানুষের কাছে সুচিকিৎসা পৌঁছে যায়, বিনা চিকিৎসায় যেন কোনো গরীব মানুষের মৃত্যু না হয়। তিনি শপথ নিয়েছিলেন দারিদ্রকে হারানোর, দারিদ্র‍্য যাতে চারপাশের আর কারোর প্রান না নিতে পারে। তিনি শপথ নিয়েছিলেন গরীব মানুষের জন্যে হাসপাতাল বানানোর।

কিন্তু বাস্তব অত সহজ নয়। ২৩ বছর বয়সে বিধবা, চার সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্বে যেন মাঝ সমুদ্র থেকে সাঁতার কাটার চেষ্টা। শুরু হল এক অসম লড়াই, এ লড়াই বেঁচে থাকার লড়াই, এ লড়াই সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার লড়াই। মাসে ১০০ টাকা উপার্জন করতে সুভাষিণী দেবী কারোর বাড়ি কাজ করেছেন, কারোর বাড়িতে রান্না করেছেন, জুতো পালিশের কাজ করেছেন, ইটভাটায় মজদুরি করেছেন। ক্ষুধার জ্বালায় লোকের বাড়ি ভাতের ফ্যান চেয়ে বেড়িয়েছেন, ভিক্ষা করেছেন। পেট চালাতে না পেরে শেষে তার ছোট ছেলে অজয়কে অনাথ আশ্রমে রেখে এসেছেন।



এরপর সুভাষিণী দেবী সবজি বিক্রির পথ বেছে নিলেন। তার তিন সন্তানকে নিয়ে ধাপায় আসলেন, সেখান থেকে সবজি কিনে পার্ক সার্কাস স্টেশনে ব্রিজ নম্বর ৪ এর কাছে সবজি বিক্রি করতেন। মাসের উপার্জন বেড়ে হলো ৫০০ টাকা। সবজি বিক্রি করে মাসিক ৫০০ টাকা আয়ে সংসার চালানোই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে তিনি সঞ্চয় করেছেন নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে, স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। স্থানীয় পোস্ট অফিসে তিনি একটি সেভিংস একাউন্ট খুললেন এবং তার সঞ্চয়ের টাকা তিনি সেখানে জমা করতে লাগলেন। কখনো জমা করেছেন ১০ টাকা, কখনো জমা করেছেন ৫০ টাকা। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি শুধু সঞ্চয় করে গেছেন। নিজের জন্যে তিনি কোনো টাকা খরচ করতেন না। সুভাষিণী দেবীর ছেলে অজয় ছিল অত্যন্ত মেধাবী, সংসারের খরচ আর সঞ্চয় ছাড়া বাকি টাকা সুভাষিণী দেবী অজয়ের পড়াশোনার পিছনে ব্যায় করতেন। সুভাষিণী দেবীর স্বপ্ন ছিল গরীব মানুষের জন্যে হাসপাতাল বানানো আর তার জন্যে তিনি দীর্ঘ ২০ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।

১৯৯২ সাল, সময় আসে, তখন সুভাষিণী দেবী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ঠাকুরপুকুরের হাঁসপুকুর (স্বামীর জন্মস্থান) গ্রামে এক কৃষি জমিতে কাজ করছেন। হঠাৎ শুনলেন সেই কৃষি জমি বিক্রি হয়ে যাবে। সুভাষিণী দেবী তার ছেলে অজয় কে নিয়ে ছুটলেন বারাসাতে সেই জমির মালিকের কাছে। তাকে শোনালেন ওনার স্বপ্নের কথা। মাত্র ১০০০০ টাকা দিয়ে সুভাষিণী দেবী কিনে নিলেন সেই জমি, তার স্বপ্ন বাস্তবতার পথে এক ধাপ এগোলো। গ্রামে ফিরে এসে সুভাষিণী দেবী গ্রামবাসীদের জানালেন ওনার স্বপ্নের কথা, তিনি বললেন তার কেনা এই জমিতে তিনি গ্রামের মানুষের জন্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলতে চান, তাদের কাছে চাইলেন সাহায্য। গ্রামের মানুষ এগিয়ে এলো, তারা সকলে মিলে ৯২৬ টাকা জোগাড় করলেন, বাকিদের মধ্যে কেউ দিলেন বাঁশ, কেউ দিলেন টিনের ছাউনি, কেউ দিলেন মাটি। বাকিরা হাত লাগালেন স্বাস্থ্যকেন্দ্র বানাতে। ১৯৯৩ সালে ২০ ফুট *২০ ফুট অস্থায়ী ঘর নির্মাণ শেষ হলো আর শুরু হলো এক রূপকথার। চালু হলো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। গ্রামবাসীরা অটোরিকশা করে আশেপাশের এলাকায় প্রচার করা শুরু করলেন। তারা আশেপাশের এলাকার ডাক্তারদের অনুরোধ করলেন যাতে সপ্তাহে একদিন তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আসেন এবং গরীব মানুষের চিকিৎসা করেন।



প্রথম এগিয়ে এলেন ডাক্তার রঘুপতি চ্যাটার্জী। তাকে দেখে আরো ৫ জন ডাক্তার এগিয়ে এলেন। তারা প্রত্যেকে বিনা পয়সায় রোগীদের চিকিৎসা করলেন। প্রথম দিনে ২৫২ জন মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করা হলো। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্ষাকাল এলো, প্রচন্ড বৃষ্টিতে অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ চালাতে অসুবিধা হলো। রোগীদের সমস্যা হলো। সুভাষিণী দেবী বুঝলেন স্থায়ী হাসপাতাল না হলে কাজ চালানো মুশকিল। কিন্তু স্থায়ী হাসপাতাল বানাতে গেলে বহু অর্থের প্রয়োজন। সাহায্যের আসায় সুভাষিণী দেবী তার ছেলে অজয়কে নিয়ে ছুটলেন তৎকালীন যাদবপুরের সাংসদ মালিনী ভট্টাচার্য্যের কাছে। মালিনী ভট্টাচার্য্য প্রথমে বিষয়টাকে অতটা গুরুত্ব দেননি, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন সুভাষিণী দেবীর স্বপ্ন, লড়াই। মালিনী ভট্টাচার্য্য সাহায্যের হাত এগিয়ে দেন, চালু হয় স্থায়ী হাসপাতাল বানানোর কাজ। ১৯৯৩ সালে পথ চলা শুরু করে "হিউম্যানিটি হাসপাতাল"| ইতি মধ্যে সুভাষিণী দেবীর ছেলে অজয় ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেন। ছেলে ডাক্তারী পাশ করার পর হাসপাতালে ডাক্তার হিসাবে যোগ দেন। এ যেন তাঁর বহু লড়াইয়ের জয়, স্বপ্ন পূরণ। স্বামী চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন, তার প্রতিশোধে ছেলেকে ডাক্তারী পড়ানো, গরীবদের জন্য বিনামূল্যে হাসপাতাল খোলা। ৩ একর জায়গার উপর তৈরি দোতলা হাসপাতালটিতে বর্তমানে প্রায় ৬০ টি সাধারণ বেড, ১০ বেডের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট আছে , ১৭ জন ডাক্তার কর্মরত। গয়নাকোলোজি, কার্ডিওলজি, ই এন টি, ইউরোলজি, অঙ্কলোজি, ডিয়াবেটোলজি এবং সার্জারি বিভাগ আছে "হিউম্যানিটি হাসপাতাল" এ। প্রতিদিন ৩০০ জন মানুষ চিকিৎসা পান। সাধারণ চিকিৎসার জন্যে রোগীকে দিতে হয় মাত্র ১০ টাকা আর জটিল অস্ত্রোপচারের জন্যে মাত্র ৫০০০ টাকা। তার ছোট মেয়ে নার্স এবং তিনিও ওই হাসপাতালের সাথে যুক্ত। সুভাষিণী দেবী ব্যবসা করার জন্যে হাসপাতাল খোলেননি, তিনি হাসপাতাল খুলেছেন গরীব মানুষকে বিনামুল্যে চিকিৎসা পৌঁছে দেবার জন্যে।

সুভাষিণী দেবী এতকিছু করার সাহস পেলেন কোথায়? তার কথায় নিজের উপর অগাধ বিশ্বাস, গরীব মানুষের উপকার করার অদম্য ইচ্ছা আর ভগবানের উপর বিশ্বাসই তার অনুপ্রেরণা। তিনি চাননি তার সাথে যা হয়েছে তা আর অন্য কোনো মানুষের সাথে হোক। তিনি নিজে কখনও সুখ সাচ্ছন্দের জীবন কাটাতে চাননি, নিজের জন্যে একটা পয়সাও খরচ করেননি।



কিন্তু তিনি অক্লান্ত, সুভাষিনী দেবীর স্বপ্ন আরও মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত সাতজেলিয়া দ্বীপে একটি ২৫ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল খুলেছেন, যেখানে মানুষের কাছে চিকিৎসা বড়লোকি স্বপ্ন, যাদের আগে দু ঘন্টা বোটে চড়ে ১৫০ কিলোমিটার অতিক্রম করে গোসাবাতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আসতে হয়। ওই অঞ্চলে এটাই প্রথম হাসপাতাল। সুভাষিনী দেবী হিউম্যানিটি হাসপাতালের ডাক্তারদের জন্য একদিন সুন্দরবনের এই হাসপাতালে চিকিৎসা বাধ্যতামূলক করেছেন। ২০ শয্যাবিশিষ্ট ওই হাসপাতালে আছে অপারেশন থিয়েটার, সোনোগ্রাফি, এক্স রে এর সুবিধা। আছে অ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা।

এছাড়াও ঝাড়গ্রামের মাণিকপাড়ায় নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবিরের ব্যবস্থা করেন, এখানে তাঁর একটি নতুন হাসপাতাল খোলার পরিকল্পনাও আছে।

মানুষের জন্যে এতো কাজ করার পরেও তিনি কিছু বছর আগে অবধিও সবজি বিক্রি করে গেছেন, অজয় ডাক্তারি পাস করার পর মা কে আর সবজি বিক্রি করতে দেননি। সুভাষিণী দেবীর কাছে "হিউম্যানিটি হাসপাতাল" তার জীবনের সবকিছু। তার জীবনের সমস্ত ভালোবাসা ওই "হিউম্যানিটি হাসপাতাল"। বয়স ৭৫ বছর হলেও তার মনে এখনো আছে আগুন, এই আগুন মানুষকে ভালোবাসার, আরো বহু গরীব মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেবার। এই আগুন তাকে আরো হাসপাতাল বানাতে অনুপ্রাণিত করে।

তিনি সবার অনুপ্রেরণা। ভারত সরকার এবছর(২০১৮) তাঁর এই পুণ্য কর্মের জন্য তাঁকে 'পদ্মশ্রী' সম্মানে ভূষিত করেছেন। তিনি আমাদের গর্ব, বাঙালির গর্ব। তাঁকে প্রণাম জানাই, দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

সুভাষিণী দেবীর স্বপ্ন "হিউম্যানিটি হাসপাতাল" কে সর্বাধুনিক করে তোলা যাতে দিনে ২৪ ঘন্টা গরীব মানুষের সেবা করা যায়| পাঠকদের কাছে অনুরোধ রইল তাঁর হাসপাতালে যথাসম্ভব দান করুন, আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সাহায্য করুন।




No comments